গল্পবিনোদন

জাদু কলসি

[মূল গল্প : সংস্কৃত ভাষায় রচিত ভারতীয় গল্প (১৯১৯)। ইংরেজেতে অনুবাদ করেছেনেএস এম মিত্র।]

গ্রামের এক কাঠুরিয়া গভীর বনে এক দল সুন্দরী পরীর সন্ধান পায়। সে তাদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিল। বিনিময়ে সে পেয়েছিল এক জাদু কলসি। সে এই জাদু কলসিকে তার জীবনের সবকিছু মনে করেছিল। এর বাইরেও যে তার এক জীবন আছে তা সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। অবশেষ সে তা বুঝতে পেরেছিল সেই জাদু কলসি হারিয়ে। বিস্তারিত পড়ুন এই ’জাদু কলসি ’গল্পে।


জাদু কলসি

অধ্যায় -১
বহুকাল আগে ভারতে সুভা নামে এক কাঠুরিয়া বাস করত। সে তার পরিবার নিয়ে একসাথে খুব সুখে শান্তিতে বাস করছিল। সে প্রতিদিন তার বাড়ির কাছের জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনতো এবং তা তিনি তার প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করতো। তা দিয়ে তার স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে ভালভাবেই দিন কাটতো। মাঝে মাঝে সে তার তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে যেতো কাঠ কাটার স্থানে। তার ছোট মেয়ে দুটি তার পাশে ঘোরাঘুরি করতো খেলাধুলা করতো। ছেলেরা তার বাবাকে সাহায্য করার জন্য কাঠ কাটার অনুমতি চাইত। তার বাবা বলত সে বৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে তিনি তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছোট কুঠার দেবেন। তিনি আরও বলতো,মেয়েরা অবশ্যই গাছের ডাল কেটে তাকে সাহায্য করতে চাইবে। কিন্তু তিনি তা পছন্দ করতেন না; কারণ ডাল কাটতে গিয়ে তারা তাদের নিজেদের হাত কেটে ফেলবে, তারা অসুস্থ হবে। এভাবেই সুভা ছেলে -মেয়েদের প্রতি খুব দয়ালু ছিলো। কাঠ কাটার কাজ অনেক কষ্টের হলেও তাদের কখনও কাজ করতে বলতো না।


অনেকদিন ধরেই সব ঠিকঠাক চলছিল সুভার সংসার। সুভা আস্তে আস্তে বৃদ্ধ হতে থাকল। এক সময় ছেলেদের প্রত্যেককে একটি করে ছোট কুড়াল দিল এবং প্রতিটি মেয়েকে ডাল কাটার জন্য একটি ছোট দা কিনে দিল। এতে ছেলে মেয়েরা তাদের দা ও কুঠার নিয়ে খুব খুশি হলো এবং গর্ব বোধ করতে লাগলো।
একবার সুভার ছেলেরা তাদের মায়ের জন্য কিছু কাঠ কেটে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সে কাঠ ততটা ভালো ছিল না। তখন তাদের বাবা তাদের বলেছিলেন যে তারা কেউই তার সাথে আসবে না, কারণ সে বনের মধ্যে অনেক ভিতরে যাবে ভালো কাঠ কাটার জন্য। ছেলেরা তাকে যেতে বারণ করে বলল- আপনি এর চেয়ে ভাল কাঠ খুঁজে পাবেন না। ছেলেরা তাকে তার সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। তারা তাদের বাবাকে বলল আপনি অনেক দূর যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন এবং একা পথ হারিয়ে ফেলবেন। তাদের বাবা বললো, আমার সাথে আসার দরকার নাই। তোমরা তোমাদের মাকে সাহায্য করো এবং তোমাদের বোনদের সাথে খেলা করো। তারা তার বাবার কথা মতোই কাজ করল।
সুভার পরিবারের সবাই মনে করেছিল যে তাদের বাবা ঠিক সময়ই ফিরে আসবে। কিন্তু অনেক দেরি হতে থাকল। অন্ধকার হয়ে আসল। তার বাবার আসার কোন নাম নেই। এদিকে বার বার তাদের মা তাকে খুঁজতে দরজার কাছে আসতো আবার ভিতরে যেতো। প্রতি মুহূর্তে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত আর অপেক্ষা করত। অনেক রাত হলো। জঙ্গলে পাখি ডাকে, তার কাছে কান্নার শব্দ মনে হয়, সে ভায় পায়। বার বার মনে করত এই বুঝি তাকে ডাকবে, দরজা খুলতে বলবে। ঘুম আসে না। তবুও বিছানায় শুয়ে চিন্তা করে আর ভাবে- যে কোনো বন্য জন্তু তাকে হত্যা করেছে এবং সে আর কখনও ফিরবে না।

প্রশ্ন: সুভাকে কি ফিরে পাবে তার পরিবার?


অধ্যায়-২
সুভা যখন বনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন,তখন তিনি সন্ধ্যায় বেলাই ফিরে আসার ইচ্ছা করেছিলো; কিন্তু যখন সে একটা গাছ কাটতে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ তার মনে হলো তার আসে-পাশে হয়তো কেউ একজন আছে। তিনি চারিদিকে তাকালো। একটু দূরেই কিছুটা খালি জায়গা। সেখানকার গাছ কেটে নেয়ার ফলে জায়গাটা অনেকটা ফাঁকা। হাঠাৎ তার চোখে পড়লো পরীর মতো সুন্দরী চার যুবতীকে। তাদের পড়নে পাতলা গ্রীষ্মের পোশাক, পিঠ জুড়ে লম্বা কালো চুল কোমর পর্যন্ত ঝুলছে। একে অপরের হাত ধরাধরি করে ঘুরে ঘুরে নাচ করছিল। সুভা এই দৃশ্য দেখে এতটাই বিস্মিত হয়েছিলো যে, হঠাৎ তার কুঠারটি হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায় এবং অন্য গাছের সাথে লেগে একটা আওয়াজ হয়। আওয়াজ শুনে যুবতীরা চমকে যায় এবং তাদের নাচ থেমে যায়। তাদের চারজনই স্থির হয়ে সুভার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সুভা কোনো কথা বলতে পারলো না, শুধু তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না তাদের একজন তাকে বলল: “তুমি কে এবং তুমি বনের গভীরে কী করছো। এখানে তো আমরা আগে কখনও একজন মানুষকেও দেখিনি?”
“আমি কেবল একজন দরিদ্র কাঠমিস্ত্রি,” সুভা উত্তর দিলো, “বিক্রি করার জন্য কিছু কাঠ কাটতে এসেছি, যাতে আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের মুখে কিছু খাবার দিতে পারি এবং কিছু কাপড় পরাতে পারি।” যুবতীদের একজন বলল, “তুমি তো খুবই বোকা,এভাবে তুমি খুব বেশি টাকা আয় করতে পারবে না। তুমি যদি আমাদের সাথেই থাকো তবে আমরা তোমার স্ত্রী এবং সন্তানদের দেখাশোনা করব এবং তোমার চেয়ে অনেক ভালো ভরণ-পোষণ দেব।”

প্রশ্ন: আপনি সুভা হলে কি করতেন? (কমেন্ট বক্সে লিখে পাঠান)।


অধ্যায়-৩
সুভা তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের খুবই ভালোবাসতো, কিন্তু সুন্দরী যুবতীদের সাথে বনে থাকার আশ্বাসে এতটাই প্রলুব্ধ হয়েছিল যে, কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর সে বললো, “হ্যাঁ, আমি তোমাদের সাথে থাকব, যদি আমার স্ত্রী সন্তানদের সাথে তোমাদের দেয়া অঙ্গিকার ঠিক থাকে।”

“তোমার এটা নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই” আরেকজন পরী বলল। “আমরা পরী,আমরা সব ধরণের বিস্ময়কর জিনিস মুহুর্তের মধ্যে তৈরি করতে পারি। তোমার প্রিয়জনরা যেখানে আছে সেখানে যাওয়া আমাদের দরকার হবে না। আমরা কেবল তাদের যা দরকার তারা তা মনে মনে চাইবে, আর তারা তা পাবে। প্রথমে তোমাকে এখন কিছু খাবার দিতে হবে। তবে বিনিময়ে আমাদের জন্য কিছু কাজ করতে হবে।”
সুভা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো, “ঠিক আছে, তোমার যা ইচ্ছা।” এখানে থেকে সমস্ত ঝড়া পাতাগুলিকে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কর করো তারপরে আমরা সবাই একসাথে বসে খাব।
সুভা দত্ত খুব খুশি হলো যে তাকে যা করতে বলা হলো তা খুব সহজ ছিল। সে একটি গাছ থেকে একটি ডাল কেটে তা দিকে ঝাড়ুর মতো বানালো এবং এটি দিয়ে মেঝে ঝাড়ু দিলো। তারপর সে চারিদিকে তাকালো, কোনো খাবার দেখতে পায় কিনা। কিন্তু সে একটা বড় কলস ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। একটা বড় গাছের ছায়ায় রাখা আছে, গাছের ডালগুলো নিচের দিকে ঝুলে আছে যেন কলসীটিকে আগলে রেখেছে । সে একজন পরীকে বললো, ”তুমি কি আমাকে দেখাবে যে খাবার কোথায় আছে এবং ঠিক কোথায় আমি ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করবো?
এই প্রশ্নে সমস্ত পরী হাসতে শুরু করল, এবং তাদের হাসির শব্দ ছিল বড় ঘন্টা বাজার শব্দের মতো।

প্রশ্ন: সুভার প্রশ্নে হাসির কী ছিল? (কমেন্ট বক্সে লিখে পাঠান)।



অধ্যায়-৪
পরীরা যখন দেখল সুভা তাদের হাসি শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল, তখন তারা আরও বেশি হাসতে লাগল, এবং তারা আবার একে অপরের হাত ধরে ঘুরে ঘুরে সারাক্ষণ হাসতে লাগল।
দরিদ্র সুভা, খুব ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত ছিলো, সে চিন্তিত হতে লাগলো এবং চিন্তা করতে লাগলো যে সে সোজা বাড়ি ফিরে যাবে। তখন সে নিচু হয়ে তার কুঠারটি হাতে নিল,এবং ঠিক তখনই মুহূতের মধ্যে এক পরী চিৎকার দেয়। সুভ থেমে যায়। কুঠার হাতে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
তাদের এক পরী বলল: ”শান্ত হও ,অপেক্ষা কর,তোমার কুঠার নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না, আমরা ওট নিয়ে ভাবছি। ঐ যে বড় কলসটি দেখতে পাচ্ছো। আমরা আমাদের সমস্ত খাবার এবং আমাদের সমস্ত কিছু চাওয়া-পাওয়া ওটা থেকে পাই। এটা হল একটা ম্যাজিক কলসি— পুরো রাজ্যে একমাত্র একটাই আছে। তুমি প্রথমে যে খাবারটি খেতে চাও তা চাইবে,তারপর আমরা চাইব।”
কথাটা শুনে সুভা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সে তার কুঠারটি মাটিতে ছুঁড়ে দিল, এবং আর দেরি না করে কলসিতে হাত দিল। তার অভ্যস্ত খাবারের জন্য কামনা করলো। সে তরকারি ভাত ডাল দুধ এবং ফল পছন্দ করতো। সে তাই চাইল এবং মুহুর্তের মধ্যে মাটিতে সুন্দর একটি পাত্রে খাবার হাজির হলো। তারপরে পরীরা একে একে খাবার চেয়ে নিল। তারপর শুভা তার কাঠ কাটার বিভিন্ন জিনিস চেয়ে নিল যা সে কখনও শোনেনি বা দেখেনি, সে নিজের জন্য চেয়ে নিয়েছে অনেক কিছু কিন্তু তাতেও সে নিজেকে বেশ অসুখী ভাবতে শুরু করলো পাছে তার স্ত্রী সন্তানদের কথা চিন্তা করে।


প্রশ্ন: আপনার কাছে একটি জাদুর কলস থাকত আপনি তার কাছে কী আশা করতেন? (কমেন্ট বক্সে লিখে পাঠান)?


অধ্যায়-৫
পরের কয়েকটা দিন স্বপ্নের মতো কেটে গেল, এবং প্রথমে সুভা ভেবেছিলেন তিনি তার জীবনে এত সুখী কখনও হয়নি। পরীরা প্রায়ই তাকে একা রেখে তারা একসাথে চলে যেত, যখন তাদের কিছু দরকার হতো ঠিক তখনি তারা কলস থেকে কিছু বের করতে ফিরে আসতো। সুভা নিজের জন্য দরকারী সমস্ত ধরণের জিনিস পেয়েছে, তবুও সে সুখী না। সে তার মজাদার খাবার ভাগ করে নেওয়ার জন্য তার স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে থাকতে চায়। সে তাদের কথা সবসময় চিন্ত করে। এবং সে তার কাজে-কর্মেও তার স্ত্রী-সন্তানদের কথা মনে পড়ে। কাজ করার সময় ছেলেরা তার কাছে থাকতো, মেয়েরা তার চারদিকে ঘোড়াঘুড়ি করতো। তার স্ত্রী তার জন্য খাবার রান্না করে অপেক্ষা করত। এসব কথা চিন্তা করে সে মোটেই ভাল ছিল না। মাঝে মাঝে সে ভাবত পরীরা যখন দূরে থাকবে তখন সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে, কিন্তু কলসীর দিকে তাকালে সে এটি ছেড়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে না।


প্রশ্ন: পরীদের কাছে থেকেও সুভার অসুখী হওয়ার প্রধান কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?



অধ্যায়-৬
সুভা স্ত্রী ও সন্তানদের কথা ভেবে ভালো ঘুমাতে পারে না। সে সারাক্ষণ ভাবে হয়তো তারা ক্ষুধার্ত আছে অথচ সে প্রচুর পরিমাণে খেতে পায়! আবার কখনও ভাবে কলসটি চুরি করে নিয়ে যাবার কথা যখন পরীরা দূরে যায়। কিন্তু এতটুকু করার তার সাহসে কুলোয় না; কখনও ভাবে সুন্দরী পরীদের অগোচরে কলসটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তারা যদি জানতে পারে তবে তারা তাকে ভয়ঙ্কর শাস্তি দিবে। এক রাতে সে একটি স্বপ্ন দেখে যা তাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। সে দেখেছিল যে তার স্ত্রী তার পছন্দের ছোট্ট বাড়িতে বসে কাঁদছে, সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটিকে তার কোলে আর ছেলেরা তার চারপাশে দাঁড়িয়ে করুন চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘুম আসে না। সে মাটিতে শুয়ে শুয়ে ভাবে- প্রতিজ্ঞা করে এবার সে একবারে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু একটু দূরে সে চাঁদের আলোতে পরীদের নৃত্যরত অবস্থায় দেখতে পায় এবং সে আবার বুঝতে পারে যে সে পরীদের এবং কলসি ছেড়ে যেতে পারবে না।
পরের দিন সে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে, পরীরা তা লক্ষ্য করেছিল এবং তাদের মধ্যে একজন তাকে বলেছিল: “ব্যাপার কী, তোমাকে এত অসুখী মনে হয় কেন? পরীটি ভাবল- এরকম অসুখী লোককে আমরা রাখতে চাই না, কষ্ট দিতে চাই না। পরী বলল- “তুমি যদি আমাদের মতো জীবন উপভোগ করতে না-ই পারবে তবে তুমি আমাদের কথায় রাজি হয়েছিলে কেন? তোমার বাড়ি ফিরে যাওয়া ভালো ছিল।” তখন সুভা খুব ভয় পেয়ে গেলে যদি তারা তাকে সত্যিই বিদায় করে দেয়; এই ভেবে সে আবার চুপ করে থাকে। এদিকে পরীরা সুভাকে খুশি করার জন্য একটা উপায় ভাবল- যখন সে ঘুমিয়ে থাকবে তখন তারা তার কানে ফিসফিস করে বলবে তার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে ভালো আছে, সুখে আছে এবং এতে সে খুশি হবে, সে তার নিজের কষ্ট ভুলে যাবে।



অধ্যায়-৭
সুভা পরীদের সহানুভূতি দেখে খুব খুশি হয়ে যায়, সে সিদ্ধান্ত নেয় সে তাদের সাথে অন্তত আরও কিছুক্ষণ থাকবে। মাঝে মাঝে অস্থির বোধ করলেও বেশ আরামেই কেটে যায় বেশ কিছু দিন। এদিকে সুভার দরিদ্র স্ত্রী তার প্রিয় সন্তানদের কিভাবে খাওয়াবে সেই উপায় খুঁজতে থাকে। তবে তার তিন ছেলে সাহসী এবং কর্মঠ তা না হলে সে সত্যিই হতাশ হয়ে পড়ত। তাদের বাবা ফিরে এলো না এবং তাকে খুঁজে বের করার জন্য তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা বৃথা যায়, তখন ছেলেরা তাদের মাকে সাহায্য করার জন্য কাজ শুরু করে। তারা বড় গাছ কাটতে পারে না, কিন্তু তারা তাদের কুড়াল দিয়ে গাছের ছোট ছোট শাখা কেটে জ্বালানি সংগ্রহ করে এবং বান্ডিল তৈরি করে তাদের প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করে। প্রতিবেশীরা তাদের সাহস দেখে মুগ্ধ হয় এবং কাঠের জন্য তাদের শুধু ভাল অর্থই দেয় না বরং প্রায়শই তাদের সাহায্য করার জন্য দুধ, চাল এবং অন্যান্য জিনিস-পত্র দেয়। সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে তারা তারা তাদের বাবাকে ছাড়া থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং ছোট মেয়েরা তার বাবার সম্পর্কে প্রায় সব স্মৃতি ভুলে গিয়েছিল। এত শীঘ্রই তাদের জীবনে এমন পরিবর্তন আসবে তারা তা স্বপ্নও ভাবেনি।

প্রশ্ন: এটা কি ছেলেদের জন্য ভাল না খারাপ ছিল যে তাদের বাবা ফিরে আসেনি?



অধ্যায়-৮
এভাবে অনেক দিন বনের গভীরে সময় কাটালো এবং দিন যত যায় ততই সে প্রিয়জনদের সাথে নিজেকে উপভোগ করতে আগ্রহী হয়। তার একটি স্বপ্ন ছিল, এক সময় সে তার স্ত্রী এবং সন্তানদের পুরানো বাড়িতে প্রচুর খাবার দেবে। তাদের খুশি করবে। তাই সে তাদের কাছে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। যেহেতু সে এখনও বেঁচে আছে, তাই সে প্রতিজ্ঞা রাখবেই। সকালে ঘুম ভাঙলো। সুভা পরীদের অপেক্ষায় থাকে। পরীরা এল- সে পরীদের বলে, “তোমাদের সাথে আর আমি থাকবো না। এখানে আমি অনেক ভালো সময় কাটিয়েছি, কিন্তু নিজের মানুষ থেকে দূরে থেকে থেকে আমি ক্লান্ত।”
পরীরা দেখল সে এবার সত্যিই তার স্ত্রী-সন্তানদের কাছে যেতে চাইছে, তাই তারা তাকে ছেড়ে দিতে সম্মত হল; পরীরা তার প্রতি সদয় হল এবং ভাবল যে সে তাদের জন্য যা করেছে তার জন্য তাদের তাকে কিছু অর্থ প্রদান করা উচিত। তারা সবাই একসাথে পরামর্শ করল এবং তারপর তাদের একজন তাকে বলল যে সে চলে যাওয়ার আগে তারা তাকে একটি উপহার দিতে চায় এবং সে যা চাইবে তারা তাকে তাই দেবে।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে সুভা বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যখন সে দেখলো যে তার স্ত্রী এবং সন্তানরা তাকে ছাড়া বাঁচতে পারে?



অধ্যায়-৯
সুভা সরাসরি শুনতে পেল যে, সে পরীদের কাছে যা চাইবে তাই পাবে। পরীরা তাকে কিছু চাইতে বললে, তখন সে চিৎকার করে বলল, “আমি জাদু কলসী চাই “।
এদিকে পরীরা চিন্তিত হলো। তারা সুভার কাছে কথা দিয়েছিল, সে যা চাইবে তাই তাকে দেবে। সত্যিকার ভাবে জাদু কলসী তাকে দিয়ে দিলে তাদের খুব কষ্ট হবে। তাছাড়া সুভা এটা জানে যে, পরীরা সবসময় তাদের দেয়া কথা রাখে। এদিকে পরীরা যদি সুভাকে কলসির বদলে অন্য কিছু নিতে রাজি করাতে না পারে, তবে বাধ্য হয়ে তাদের মূল্যবান কলসী তাকে দিতে হবে এবং তাদের নিজেদের জন্য খাবার খুঁজতে হবে এবং সেটা হবে তাদের জন্য কষ্টের। তাই তারা সুভাকে অন্য কিছু বেছে নিতে রাজি করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। তারা তাকে তাদের নিজস্ব একটি গোপন ধন-গৃহে নিয়ে গেল, একটি পুরানো গাছের কোটরের মধ্যে। তারা গাছের কোটরে ঢোকার আগে তার চোখ বেঁধেছিল,যাতে সে কখনই পথ চিনতে না পারে এবং তাদের মধ্যে একজন তাকে হাত ধরে অন্ধকার পথ ধরে কোটরের মধ্যে নিয়ে যায়। অবশেষে যখন তার চোখের বাধন খুলে দিল তখন সুভা দেখলো সে একটি উঁচু জায়গায় একটি গুহার মধ্যে যার ছাদের দিকটা খোলা। যেখান থেকে আলো আসছিল। মেঝেতে স্তূপ করা ছিল প্রচুর সোনা ও রূপার ঝক্ঝকে রত্ন এবং দেয়ালে সুন্দর সুন্দর পোশাক টাঙানো ছিল। সুভা তাদের এই প্রতারণায় বেশ হতবাক হয়েছিলো, কিন্তু সে একজন বোকা কাঠুরে ছিলো, গহনা ও কাপড়ের মূল্য বুঝতে পারেনি। তাই যখন পরীরা তাকে বলল, “এখান থেকে তোমার পছন্দের সব কিছু বেছে নাও এবং আমাদের কলস আমাদের ফিরিয়ে দেও”। সে মাথা নেড়ে বলল: “না। আমি কলস চাই”! একের পর এক পরী রুবি, হীরা এবং অন্যান্য মূল্যবান পাথর তুলে আলোয় সামনে ধরে রাখল, যাতে সুভা দেখতে পারে সেগুলি কত সুন্দর, কত দামি এবং কিন্তু না, তাতেও সে রাজি হলো না। এরপর তারা কিছু দামি পোশাক নামিয়ে তাকে পরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। তাতেও কোনো কাজ হলো না। সুভা বলে- “না! আমার কলস! আমি কলস চাই!” শেষ পর্যন্ত তাদের এটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তারা আবার তার চোখ বেঁধে তাকে কলসের কাছে নিয়ে গেল।


প্রশ্ন: আপনি কি পছন্দ করতেন- কলসি না গহনা? কী কারণে সুভা কলস নেয়ার জন্য এতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল?



অধ্যায়-১০
যখন তারা আবার কলসের কাছে ফিরে এল তখন পরীরা আবার কলস ফেরত রাখার জন্য নতুন ফন্দি আটল। এবার তারা সুভাকে বলল “এটা খুব সহজে ভেঙ্গে যাবে”। এটি তোমার বা অন্য কারো জন্য ভাল হবে না। কিন্তু তুমি তার চেয়ে ভাল হবে যদি কিছু টাকা নাও, তাহলে তুমি তা দিয়ে তোমার পছন্দ মতো কিছু কিনতে পারবে।
“না না না!” সুভা কেঁদে উঠল। “কলস! আমার কলস লাগবে!”
তখন পরীরা বলল, “তাহলে খুব ভাল, ঠিক আছে তোমার কলসটি নাও” এবং তারা দুঃখের সাথে বলল, আমরা আর কখনও তোমার মুখ দেখব না!তুমি এখনই কলস নিয়ে চলে যাও”
সুভা কলস নিয়ে রওনা হল। খুব সাবধানে বহন করল। পাছে বাড়ি ফেরার আগেই যেন এটি পরে ভেঙে না যায়। পরীদের কাছ থেকে এটি কেড়ে নিয়ে এসেছে এবং এতে তাদের হয়তো অনাহারে থাকতে হবে, না হয় তাদের নতুন করে খাবারের খোঁজ করতে হবে। কী নিষ্ঠুর কাজ তা সে মোটেও ভাবেনি। সে যখন কলসটি নিয়ে আসছিল বেচারা পরীরা তাকে অনেক্ষণ ধরে সুভাকে দেখছিল যতক্ষণ না সে দৃষ্টির বাইরে যায়। তারপর তারা কাঁদতে থাকে। তাদের একজন তাকে খুব স্বার্থপর বলেছিলো। অন্য আর একজন বলেছিলো- “এসো, আমরা তার সম্পর্কে সব ভুলে গিয়ে কিছু ফল খুঁজতে যাই।”
তাই তারা সবাই কান্নাকাটি ছেড়ে হাতে হাত রেখে চলে গেল। এখন আর পরীরা খুব একটা খেতে চায় না। তারা ফল খেয়েই বেঁচে থাকতে পারে এবং তারা কখনও কোন কিছু জন্য দীর্ঘ সময়ের জন্য দুঃখ করে না। তারা কলসটির কথা ভুলে গেল। তারা সুভাকে কলসিটি দিয়েছে তাতে তারা অখুশি না। তার কারণ তারা নিশ্চিত যে তারা সুভাকে কলসটি দিয়ে সুভার প্রতি উদারতা দেখিয়েছে।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে সুভার কলস চাওয়া ভুল ছিল?



একাদশ-১১
সুভার স্ত্রী এবং সন্তানরা যখন তাকে তার বাড়ির দিকে আসতে দেখল তখন সবাই খুব অবাক হয়েছিল। তবে সে কলসটি সঙ্গে নেয়নি, এটি তার ঘরের কাছে একটি ফাঁপা গাছের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল, কারণ সে তার স্ত্রী সন্তানদের কলসের বিষয়ে জানাতে চায়নি। সে তার স্ত্রীকে বলেছিলো যে সে বনে তার পথ হারিয়েছিল এবং ভয় পেয়েছিলো যে সে তার সন্তানদের আর কখনও দেখতে পাবে না, কিন্তু সে পরীদের সম্পর্কে কিছুই বলেনি। যখন তার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে সে কীভাবে খাবার পেয়েছে,উত্তরে সে তাকে একটি দীর্ঘ গল্প বলেছিল এবং তার স্ত্রী তা বিশ্বাস করেছিল। সুভা মনে মনে ভাবে, এখন সে তার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যখন সে ছোট মেয়েকে কাছে ডাকলো তখন সে তার বাবার জন্য ভালো কিছু খাবার দেবার জন্য ব্যাকুল হল, তখন সুভা বললো, “ওহ,এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নাই! আমি আমার সাথে কিছু খাবার এনেছি। আমি গিয়ে নিয়ে আসব, কিন্তু আমার সাথে কেউ আসবে না।”
সুভার স্ত্রী এতে খুব হতাশ হয়েছিলো, কারণ সে তার স্বামীকে এতটাই ভালোবাসতো যে তার জন্য কিছু খাবার রান্না করা তার কাছে অনেক আনন্দের ছিল। তার ছেলেরা তার বাবার সাথে যেতে চাইলে সে তাদের নিষেধ করল। সে একটা বড় ঝুড়ি নিল এবং একাই কলসির কাছে গেল। খুব শীঘ্রই সে আবার ভাল ভাল খাবার ঝুড়িতে নিয়ে ফিলে এল, যার নাম তার স্ত্রী এবং সন্তানদের জানা ছিল না। সবাই খুব খুশি হল। সুভা তখন আনন্দে কাঁদল। আবার সে গর্বিত হল এই বলে যে, সে একজন চতুর লোক সে পরীদের কাছ থেকে এটা আনতে পেরেছে এবং সে যখন তার স্ত্রীকে গল্প বলেছিল তখন সে কলসটির কথা এড়িয়ে গিয়েছিল।


প্রশ্ন: কাজ না করে বাচ্চাদের জন্য এই সমস্ত খাবার আনা কি ভাল কাজ ছিল?


অধ্যায়-১২
সুভার জীবনে অনেক পরিবর্তন আসল। বনের জীবন থেকে তা সম্পূর্ণরূপে আলাদা। সুভা আর কাঠ বিক্রি করতে যায় না। ছেলেরাও আর কাঠ কাটে না। প্রতিদিন তাদের বাবা তাদের সবার জন্য নতুন নতুন খাবার আনে। তবে তার পরিবারের প্রত্যেকের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল এই সমস্ত খাবার কোথা থেকে আসে তা খুঁজে বের করা। কিন্তু তারা কখনই তা করতে পারেনি,কারণ সুভা যখন খাবার আনতে ঝুড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলো তখন সে তার ছেলেমেয়েদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছিল। তাছাড়া সে তার স্ত্রীর কাছেও ঘটনাটি গোপন রেখেছিলো। কারণ তাতে অতি তাড়াতাড়ি বাড়ির সুখ-শান্তি নষ্ট হতো। খাবারের কথা জানার জন্য তাদের আর কিছু করার ছিল না। ফলে তারা বিষয়টি নিয়ে হতাশ হয়েছিল। তাদের মা আরও দুঃখ পেতে থাকে। অবশেষে সুভার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিল যে, যদি তার স্বামী তাকে খাবারের রহস্যের কথা না জানায়, তবে সে তার কাছ থেকে দূরে চলে যাবে এবং তার ছোট মেয়েদেরও সাথে নিয়ে যাবে। একদিন সুভার স্ত্রী সত্যিই মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। কিন্তু হঠাৎ সবকিছু আবার আগের মতো হল। তাদের বাড়ি কয়েকজন প্রতিবেশী আসল,যারা ছেলেদের কাছ থেকে জ্বালানি কিনত আর তাদের ফল ও চাল দিয়ে সাহায্য করতো, তারা তাদের বাবার ফিরে আসার বিস্ময়কর খবর জানতে পেরেছিল। তারা জেনেছিল এখন আর তাদের পরিবারে অভাব নেই। প্রতিদিন প্রচুর খাবার আসে তাদের পরিবারে। কিন্তু কোথা থেকে আসে তা তারা কেউই জানত না। ঐ দিন প্রতিবেশীরা অনেক খাবার খেল। তারা তা কোথা থেকে এসেছে জানল না।
সুভা যে এত সব খাবার জোগাড় করতে পারে তা সবাইকে গর্ব করে বলতে খুব পছন্দ করতো এবং মাঝে মাঝে প্রতিবেশীদের ও পুরনো বন্ধুদের তার কাছে এসে তার সাথে খাবার খেতে বলতো। সুভার বন্ধুরা যখন আসত তখন তারা প্রায়ই দেখত সুন্দর সুন্দর মদের বোতল। কিছু খালি মদের বোতলও মাটিতে ছড়িয়ে থাকত।
এভাবে কয়েক মাস চলতে থাকে, সুভা যা কিছু করতে পারে তার জন্য সে গর্বিত এবং আস্তে আস্তে আরো গর্বিত হয়ে উঠতে থাকে। সে সবসময় মনে করতো তার গোপন রহস্য কখনই কেউ জানতে পারবে না। তবে প্রত্যেকে এই গোপন রহস্য খুঁজে বের করার জন্য কৌতুহলী হয়ে উঠল। অনেকে গোপনে তাকে অনুসরণ করতো। কিন্তু সুভা প্রতি রাতে সে তার কলসিটি ক্রমাগত একটি নতুন জায়গায় লুকিয়ে রাখত।
এখন সে কেবল তার কলস থেকে খাবার এবং বিশুদ্ধ জল পান করেই সন্তুষ্ট থাকে না। এখন সে মদসহ বিভিন্ন প্রকার পানীয় সংগ্রহ করে। এর আগে সে তার কলস থেকে জল ছাড়া আর কিছু পান করেনি, তবে সে এখন প্রায়শই খুব বেশি মদ পান করে। এখন এটিই তার প্রিয় কলস হারানোর দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে উঠতে থাকে। সুভা নিজের জন্য গর্ব করতে শুরু করে, তার বন্ধুদের বলতে থাকে এমন কিছু নেই যে সে তাদের জন্য এনে দিতে পারে না।
একদিন যখন সে তাদের একটি খুব বড় ভোজের আয়োজন করলো, যাতে সে বেশ কিছু বিরল ধরণের খাবার চেয়েছিল, সে খুব বেশি মদ পান কলেছিল – এতটাই মদ পান করেছিল যে সে তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। প্রতিবেশীরা এই সুযোগটির অপেক্ষায় ছিল। তারা তাকে উত্যক্ত করতে শুরু করে, তাকে বলে যে তারা বিশ্বাস করে যে সে সত্যিই একজন বড় ধরনের ডাকাত। যে সে খাবার কেনার জন্য টাকা চুরি করেছে। এতে সে রেগে গেল এবং শেষ পর্যন্ত সে নির্বোধের মত কাজ করে। সে তাদের সবাইকে তার সাথে আসতে বলে। সে তাদের দেখাবে যে সে কোন ডাকাত নয়। তাঁর স্ত্রী এই কথা শুনে কিছুটা খুশি হলো এই ভেবে যে, শেষ পর্যন্ত হয়তো রহস্যে বেরিয়ে আসবে,আর ভয় পেলো যে ভয়ানক কিছু না ঘটে। বাচ্চারাও খুব উত্তেজিত ছিল। তারা সুভার সাথে গিয়েছিল, তারা কলসের সর্বশেষ লুকানোর জায়গাটির প্রায় কাছে পৌঁছেছিল, এমন সময় সুভা বুঝতে পারল যে সে খুব বোকামি করতে যাচ্ছে। সে হঠাৎ থেমে গেলো, পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো এবং সবাইকে বললো যতক্ষণ না তারা সবাই ঘরে ফিরে যাচ্ছে ততক্ষণ সে এক কদম এগোবে না। তার স্ত্রী তাকে অনুরোধ করেছিল যে তাকে অন্তত তার সাথে নিয়ে যেতে এবং ছেলেমেয়েরা সকলেই দাবি করেছিল যে তাদের মাকে যেন ফেরত না পাঠায়। কিন্তু এটি সহজ ছিল না। তাদের সবাইকে ফিরে যেতে হয়েছিল। সুভা তাদের দৃষ্টির বাইরে না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়েছিল।

প্রশ্ন: সুভার কলসের রহস্য সম্পর্কে তার স্ত্রীকে বলা উচিত ছিল কি?


অধ্যায়-১৩
সুভা যখন নিশ্চিত হয়ে গেল যে সবাই চলে গেছে এবং কেউ তাকে আর দেখতে পাচ্ছে না। তখন সে যে গর্তের মধ্যে কলসটি লুকিয়ে রেখেছিল সেখান থেকে তুলে নিয়ে অতি সাবধানে তার বাড়িতে নিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে কলসটি নিয়ে ঘরের দিকে যেতে দেখে ফেলে। তখন সবাই তার কাছে ছুটে আসে এবং তার চারপাশে ভিড় করে, যাতে কলসটি মাটিতে পড়ে যায় এবং ভেঙে যায়। সুভা অবশ্য কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই তার ঘরে ঢুকলো এবং তারপর সে কলস থেকে জিনিসপত্র বের করে সবকিছু মাটিতে ছুঁড়তে শুরু করলো আর চিৎকার করে বলতে লাগলো,”আমি ডাকাত? আমি কি ডাকাত?” তারপর,আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে, সে কলসটি তার কাঁধে তুলে লাফাতে শুরু করে । তার স্ত্রী তাকে বার বার সাবধান করে,”ওহ,এভাবে করো না। তুমি কলসটি ফেলে দেবে! ভেঙে যাবে!” কিন্তু সে তার কথায় কান দেয় না। লাফাতে লাফাতে হঠাৎ সুভা মাটিতে লুটিয়ে পরে এবং কলসটি তার কাধ থেকে ছিটকে পরে যায়। কলসটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। কারো মুখে কোনো কথা নাই। অনেকে এটিকে একটি দুর্ঘটনা মনে করে। কেউ কেউ কেঁদে ফেলল। আবার কেউ কেউ মনে মনে খুব খুশি হলো। সুভা ইচ্ছা করেই এই কাজটি করেছিল। কারণ এতে হয়তো তার মদ পান করার ইচ্ছা প্রতিহত হবে। আবার সে চিন্তা করে যদি সে মদ পানের ইচ্ছা আগেই প্রতিহত করতে পারতো তবে তার এমনটি করতো হতো না। তার এই মূল্যবান ধন এখনও থাকত।
সুভা টুকরোগুলো আবার একসাথে জড়ো করে। যদি এগুলো জোড়া লাগানো যায়। তবে এটা অসম্ভব। হঠাৎ সে একটি হাসির শব্দ শুনতে পায় এবং তার বাচ্চাদের হাততালির মতো শুনলো। সে এও শুনলো তার বাচ্চারা বলছে- “আমাদের কলস আবার আমাদের!” … না; তা আর হবার না। যদি হতো … হয়তো কলসে থাকা ফল কেক, সুস্বাদু খাবার তার স্ত্রী,সন্তান এবং তার বন্ধুদের খাওয়াতে পারতো!
সবাই সুভার দিকে বিষণ্ণ এবং রাগান্বিতভাবে তাকিয়ে থাকে। একসময় তার বন্ধুরা যার যার বাড়িতে একে একে চলে যায় সুভাকে তার পরিবারের সাথে একা রেখে।

প্রশ্ন: আপনি যদি সুভার স্ত্রী হতেন, এমন একটি দুঃসময় আপনি কী করতেন?


অধ্যায়-১৪
এই যাদু কলস গল্পের এখানেই সমাপ্তি,তবে এটি ছিল সুভা ও তার পরিবারের জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই বিস্ময়কর কাজ করা কলসটির কথা তারা কখনই ভুলতে পারেনি। বাচ্চারা কখনই তাদের বাবা কীভাবে এটি পেয়েছিল তা জানেতে চায়নি। তবে তারা প্রায়শই বনে বনে ঘুরে বেড়াত এই আশায় যে তারাও যদি কিছু আশ্চর্যজনক ও দুঃসাহসিক কিছু কাজের সন্ধান পায়। কিন্তু তারা কখনই পরী কিংবা একটি জাদুর কলস খুঁজে পায়নি। তারা ধীরে ধীরে আবার তাদের পুরানো পেশায় ফিরে আসে। সুভা এটা খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছিল- সে আর কখনও তার স্ত্রীর কাছ থেকে কোনো কিছু গোপন করবে না। কারণ সে নিশ্চিত হয়েছিল যে, সে যদি প্রথম বাড়িতে আসার পর কলসের আসল রহস্য তার স্ত্রীকে বলতো,তবে হয়তো তার এই মূল্যবান ধন হারাতে হতো না। হয়তো একটা উপায় বের করতো।



প্রশ্ন : কলসটি হারানোর পিছনে সুভার সবচেয়ে বড় ভুল কি ছিল।

গল্পটি এখানেই শেষ।

Share on Social Media