কবিতাবিনোদন

হারানো দিনের কবিতা

পুরানো দিনের কবিতা যা আমরা আজ হারাতে বসেছি । নতুন প্রজন্ম আজ এসব মজার কবিতা থেকে বঞ্চিত। তাই সেগুলো সংগ্রহ করে এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই উদ্দেশ্য। এখানে কিছু মজাদার কবিতা নিচে দেয়া হল —

ঠিক আছে

সুকুমার বড়ুয়া

অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলো দিক আছে
তিনি হেসে বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।

রেশনের পচা চাল
টলটলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙা-চোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।

মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতাখান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু কটা শিক আছে
তবু তিনি বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।

কেমন বড়াই

হাবীবুর রহমান


লোকটা শুধু করত বড়াই–
‘দেখে নিতাম লাগলে লড়াই !’
উইঢিবিতে মারতো ঘুষি
চোখ পাকিয়ে জোরসে ঠুসি।
বাহু ঠুকে ফুলিয়ে ছাতি
বলত- আসুক বাঘ কি হাতি !
আমি কি আর কারেও ডরাই ?
ভাঙতে পারি লোহার কড়াই।
শুনে সবে কাঁপত ডরে,
খিল লাগিয়ে থাকত ঘরে।
এক দিন এক ভোরের বেলায়
বেবাক লোকের ঘুম ভেঙে যায়,
ঘর ছেড়ে সব বাইরে এসে
বাড়িয়ে গলা দেখল শেষে;
ঢিবির পাশে বাঁধের গোড়ায়,
লোকটা কেবল গড়িয়ে বেড়ায়।
‘ব্যাপার কি ভাই, ব্যাপার কি ভাই’-
ফিসফিসিয়ে বলল সবাই।
লোকটা তখন চেঁচিয়ে জানায়–
‘উই ধরেছে নাকের ডগায় !

সবার আমি ছাত্র

সুনির্মল বসু


আকাশ আমায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাই রে,
কর্মী হবার মন্ত্র আমি
বায়ুর কাছে পাই রে।

পাহাড় শিখায় তাহার সমান
হই যেন ভাই মৌন-মহান,
খোলা মাঠের উপদেশে
দিলখোলা হই তাই রে।

সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়
আপন তেজে জ্বলতে,
চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে,
মধুর কথা বলতে।

ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর
অন্তর হোক রত্ন-আকর
নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম
আপন বেগে চলতে।

মাটির কাছে সহিষ্ণুতা
পেলাম আমি শিক্ষা,
আপন কাজে কঠোর হতে
পাষাণ দিল দীক্ষা।

ঝরনা তাহার সহজ গানে,
গান জাগাল আমার প্রাণে;
শ্যাম বনানী সরসতা
আমায় দিল ভিক্ষা।

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,
সবার আমি ছাত্র,
নানান ভাবে নতুন জিনিস
শিখছি দিবারাত্র।

এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়,
পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়
শিখছি সে সব কৌতূহলে,
নেই দ্বিধা লেশমাত্র।

পাছে লোকে কিছু বলে

কামিনী রায়

করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,-
পাছে লোকে কিছু বলে।

আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।

হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;-
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,-
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।


কাজের ছেলে

যোগীন্দ্রনাথ সরকার

দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল,চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।
পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি, পাছে হয় ভুল;
ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়,”
” ছিঁড়ে দেবে চুল।

দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।

বাহবা বাহবা – ভোলা ভুতো হাবা খেলিছে তো বেশ!
দেখিব খেলাতে, কে হারে কে জেতে, কেনা হলে শেষ।
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
ডিম-ভরা বেল, দু’টা পাকা তেল, সরিষার কৈ।

ওই তো ওখানে ঘুরি ধরে টানে, ঘোষদের ননী;
আমি যদি পাই, তা হলে উড়াই আকাশে এখনি!
দাদখানি তেল, ডিম-ভরা বেল, দুটা পাকা দৈ,
সরিষার চাল, চিনি-পাতা ডাল, মুসুরির কৈ!

এসেছি দোকানে-কিনি এই খানে, যত কিছু পাই;
মা যাহা বলেছে, ঠিক মনে আছে, তাতে ভুল নাই!
দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, সরিষার কৈ,
চিনি-পাতা চাল, দুটা পাকা ডাল, ডিম ভরা দৈ।

হবুচন্দ্রের আইন

সুনির্মল বসু


হবুচন্দ্র রাজা বলেন, গবুচন্দ্রে ডেকে–
আইন জারি করে দিও রাজ্যেতে আজ থেকে,
মোর রাজ্যের ভিতর
হোকনা গরীব, ভদ্র কিম্বা ইতর,
কাঁদতে কেহ পারবেনা’ক, যতই মরুক শোকে,
হাসবে আমার যতেক প্রজা, হাসবে যত লোকে।
শান্ত্রী-সেপাই, প্যায়দা-পাইক ঘুরবে ছদ্মবেশে,
কাঁদলে কেহ, আনবে বেঁধে, শাস্তি হবে শেষে।’

বল্লে গবু– ‘হুজুর,–
ভয় যদি কেউ পায় কখনো দৈত্য, দানা, জুজুর,
কিম্বা যদি পিছলে প’ড়ে মুন্ডু ফাটায় কেহ,
গাড়ীর তলে কারুর যদি থেঁতলিয়ে যায় দেহ,
কিম্বা যদি কোনো প্রজার কান দুটি যায় কাটা,
কিম্বা যদি পড়ে কারুর পিঠের উপর ঝাঁটা,
সত্যিকারের বিপন্ন হয়ে যদি,
তবুও কি সবাই তারা হাসবে নিরবধি?’

রাজা বলেন, — গবু,
আমার আইন সকল প্রজার মানতে হবে তবু।
কেউ যদি হয় খুন বা জখম, হাড্ডিতে ঘুণ ধরে,
পাজঁরা যদি ঝাঁঝরা হয়ে মজ্জা ঝ’রে পড়ে,
ঠ্যাংটি ভাঙে, হাতটি কাটে, ভুঁরিটি যায় ফেঁসে,
অন্ধকারে স্কন্ধকাটা ঘাড়টি ধরে ঠেসে,
কিম্বা যদি ধড়ের থেকে মুন্ডুটি যায় উড়ে,
কাঁদতে কেহ পারবে নাক বিশ্রী বিকট সুরে।
হবু চন্দ্রের দেশে–
মরতে যদি হয় কখনো, মরতে হবে হেসে।

পিটিয়ে দিল ঢ্যাঁড়া গবু রাজার আদেশ পেয়ে–
‘কাঁদতে কেহ পারবেনা আর, পুরুষ কিম্বা মেয়ে,
যতই শোকের কারণ ঘটুক, হাসতে হবে তবু,
আদেশ দিলেন রাজাধিরাজ হবু,
রাজার আদেশ কেউ যদি যায় ভুলে,
চড়তে হবে শূলে।

সেদিন হতে হবুর দেশে
উল্টে গেল রীতি,
হররা-হাসির হট্রগোলে,
অট্র-হাসির অট্ররোলে,
জাগলো তুফান নিতি।
হাসির যেন ঝড় বয়ে যায়
রাজ্যখানি জুড়ে,
সবাই হাসে যখন তখন
প্রাণ-কাঁপানো সুরে।
প্যায়দা-পাইক ছদ্মবেশে হদ্দ অবিরত,
কান্না কারো শুনতে না পায়, হাঁপায় রীতিমত।
সবাই হাসে আশে-পাশে,
বিষম খেয়ে ভীষণ হাসে,
আস্তাবলে সহিস হাসে, আস্তাকুঁড়ে মেথর,
হাসছে যত মুমূর্ষুরা হাসপাতালের ভেতর।
আইন জেনে সর্ব্বনেশ
ঘাটের মড়া উঠছে হেসে,
বেতো-রোগী দেঁতো-হাসি হাসছে বসে ঘরে!
কাশতে গিয়ে কেশো বুড়ো হাসতে সুরু করে।
হাসছে দেশের ন্যাংলাফ্যাচাং হ্যাংলো-হাঁদা যত,
গোমরা-উদো-নোংরা-ডোঁপো-চ্যাংড়া শত শত,
কেউ কাঁদে না কান্না পেলেও,
কেউ কাঁদে না গাঁট্রা খেলেও,
পাঠশালাতে বেত্র খেয়ে ছাত্রদলে হাসে,
কান্না ভুলে শিশুর দলে হাসছে অনায়াসে।

রাজা হবু বলেন আবার গবু চন্দ্রে ডাকি,
‘আমার আইন মেনে সবাই আমায় দিল ফাঁকি!
রাজ্যে আমার খাঁদার কথা সবাই গেল ভুলে,
কেউ গেলনা শূলে?
একটা লোকও পেলামনা এইবারে
শূলে চড়াই যারে।
নিয়ম আমার কড়া
প্রতিদিনই একটি লোকের শূলেতে চাই চড়া।
যা হোক, আজই সাঁঝের আগে শূলে দেবার তরে–
যে করে হোক একটি মানুষ আনতে হবে ধরে।

গবুচন্দ্র বল্লে হেসে চেয়ে রাজার মুখে,
‘কাঁদতে পারে এমন মানুষ নাই যে এ মুলুকে
আমি না হয় নিজেই কেঁদে আইন ভেঙে তবে
চড়ব শূলে, মহারাজের নিয়ম রক্ষা হবে
কিন্তু একি, আমিও যে কাঁদতে গেছি ভুলে
কেমন করে চড়ব তবে শূলে?’

রাজা বলেন, ‘তোমার মত মূর্খ দেখি নাযে,
কাঁদতে তুমি ভুলে গেছ এই ক’দিনের মাঝে?
এই দ্যাখোনা কাঁদে কেমন করে’–
এই না বলে হবু রাজা কেঁদে ফেললেন জোরে।

মন্ত্রী গবু বল্লে তখন, ‘এবার তবে রাজা–
নিজের আইন পালন করুন, গ্রহণ করুন সাজা।’
বলেন হবু, ‘আমার হুকুম নড়বে না এক চুল,
আমার সাজা আমিই নেব, তৈরি কর শূল।’

তালগাছ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তালগাছ        এক পায়ে দাঁড়িয়ে
                      সব গাছ ছাড়িয়ে
                            উঁকি মারে আকাশে।
মনে সাধ,      কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়
                      একেবারে উড়ে যায়;
                            কোথা পাবে পাখা সে?
তাই তো সে    ঠিক তার মাথাতে
                      গোল গোল পাতাতে
                            ইচ্ছাটি মেলে তার,–
মনে মনে       ভাবে, বুঝি ডানা এই,
                      উড়ে যেতে মানা নেই
                            বাসাখানি ফেলে তার।
সারাদিন       ঝরঝর থত্থর
                      কাঁপে পাতা-পত্তর,
                            ওড়ে যেন ভাবে ও,
মনে মনে       আকাশেতে বেড়িয়ে
                      তারাদের এড়িয়ে
                            যেন কোথা যাবে ও।
তার পরে       হাওয়া যেই নেমে যায়,
                      পাতা-কাঁপা থেমে যায়,
                            ফেরে তার মনটি
যেই ভাবে,     মা যে হয় মাটি তার
                      ভালো লাগে আরবার
                            পৃথিবীর কোণটি।

ঘুড়ি

আবুল হোসেন


ঘুড়িরা উড়িছে বন মাথায়।
হলদে সবুজে মন মাতায়।
গোধূলির ঝিকিমিকি আলোয়
লাল সাদা আর নীল কালোয়
ঘুড়িরা উড়িছে হালকা বায়।
ঘুড়িরা উড়িছে হালকা বায়,
একটু বাড়িলে টান সুতায়
আকাশে ঘুড়িরা হোঁচট খায়।
সামলে তখন রাখা যে দায়,
উটিছে নামিছে টালমাটাল।
ভারি যে কঠিন ঘুড়ির চাল।
ভারি যে কঠিন ঘুড়ির চাল,
সাধ্যি কি চিল পায় নাগাল!
প্যাঁচ লেগে ঘুড়ি কেটে পালায়
আকাশের কোথা কোন কোনায়।
ঘুড়িরা পড়ছে হাতেতে কার,
খবর রেখেছে কেউ কি তার?

ষোল আনাই মিছে

সুকুমার রায়


বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে,
মাঝিরে কন, ”বলতে পারিস সূর্যি কেন ওঠে?
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?”
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে হাসে।
বাবু বলেন, ”সারা জীবন মরলিরে তুই খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি।”
খানিক বাদে কহেন বাবু, ”বলতো দেখি ভেবে
নদীর ধারা কেমনে আসে পাহাড় থেকে নেবে?
বলতো কেন লবণ পোরা সাগর ভরা পানি?”
মাঝি সে কয়, ”আরে মশাই অত কি আর জানি?”
বাবু বলেন, ”এই বয়সে জানিসনেও তা কি
জীবনটা তোর নেহাৎ খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি!”
আবার ভেবে কহেন বাবু, ” বলতো ওরে বুড়ো,
কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চুড়ো?
বলতো দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহণ লাগে কেন?”
বৃদ্ধ বলে, ”আমায় কেন লজ্জা দেছেন হেন?”
বাবু বলেন, ”বলব কি আর বলব তোরে কি তা,-
দেখছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।”
খানিক বাদে ঝড় উঠেছে, ঢেউ উঠেছে ফুলে,
বাবু দেখেন, নৌকাখানি ডুবলো বুঝি দুলে!
মাঝিরে কন, ” একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি,
ডুবলো নাকি নৌকা এবার? মরব নাকি আজি?”
মাঝি শুধায়, ”সাঁতার জানো?”- মাথা নাড়েন বাবু,
মূর্খ মাঝি বলে, ”মশাই, এখন কেন কাবু?
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,
তোমার দেখি জীবন খানা ষোল আনাই মিছে!’

এমন কী আর খাই

সুনির্মল বসু



তোমরা যাই বলো না ভাই,
এমন কী আর খাই!
আস্ত পাঁঠা হলেই পরে
ছোট্ট আমার পেটটা ভরে
যদি তার সঙ্গে ফুলকো লুচি
গণ্ডা বিশেক পাই
এমন কী আর খাই!
চপ কাটলেট পড়লে পাতে
আপত্তি আর নাই কো তাতে
আর কোপতা কাবাব কালিয়াতে
অমত আমার নাই
এমন কী আর খাই!
হয় না হজম এখন দাদা
খাওয়া দাওয়ায় অনেক বাধা,
এখন তাইতো অনেক বুঝেসুঝে
খাবার খেতে চাই
এমন কী আর খাই!
সের পাঁচ-ছ’য় রাবড়ি-দধি
তোমরা আমায় খাওয়াও যদি,
কষ্ট করে এই বয়সেও
খেতেও পারি তাই
এমন কি আর খাই!
সন্দেশ আর পান্তুয়াতে,
রুচি বিশেষ নাইকো তাতে,
আপাতত দুসের হলেই,
ঠাণ্ডা হয়ে যাই
এমন কী আর খাই!
মা কেঁদে কয়, ‘এমন করে
না খেয়ে তুই যাবি মরে
শুকিয়ে শরীর আমসি হলো।
কি আর করি ছাই
এমন কি আর খাই!

Share on Social Media